অজানা ভয় এর আতঙ্ক


’ভয়’ একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। যে বিষয়টি থেকে বা যার থেকে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি বা আগে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি সেই বিষয় বা ব্যক্তি থেকে ভয় পাওয়াটা অতি স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এছাড়াও আমরা ’জেনারালইজেশন’ করে ভয় পেয়ে থাকি। ’জেনারালাইজেশন’ অর্থাৎ অতিরিক্ত সাধারণীকরণ করা। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ধরুন কোন একটি রাস্তায় চলাকালীন আপনার একটি নেতিবাচক স্মৃতি রয়েছে, হয়তো দূর্ঘটনার স্বীকার হয়েছিলেন, পরবর্তীতে ঐ রাস্তার মত দেখতে অন্য রাস্তাও আপনি এড়িয়ে চলছেন। অর্থাৎ আপনি পৃথিবীর সব রাস্তাকে একরকম মনে করতে শুরু করেছেন। এবং ধরে নিচ্ছেন যে সব জায়গায় একই ঘটনা ঘটবে। যদিও এটি যৌক্তিক নয়।

ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এটি ভিন্নভাবে অনুভূত হয়

সবার মনের অবস্থা যেমন সবসময় একরকম থাকে না। আবার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে মানুষের অনুভূতির তীব্রতা ও ধরনেও আসে পরিবর্তন। যে মানুষটা হয়তো এক সময় প্রাণখুলে সবার সাথে মিশতে পারতো। সে কিছু নির্দিষ্ট কারণে একই ভাবে আচরণ করতে নাও পারে। আবার পূর্বের কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে আগের মত প্রাণোদ্দ্যম করতে নাও পারে। এটি ভিন্ন অন্য কারণেও ঘটতে পারে আবার অজানা ভয় এর আতঙ্ক থেকেও হতে পারে।

কিন্তু যে ভয়টি আপনার একদম ই অজানা কারণে হচ্ছে, সেটি একটু ভিন্ন রকম। অর্থাৎ, সেটি নার্ভাস অনুভূতির সাথে উদ্বিগ্নতা মিশে একটি অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্ম দেয়। সহজ ভাষায় আমরা এটিকেও অজানা ভয় হিসেবে নামকরণ করে থাকি। বিশেষ করে আমরা যখন কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই যেটির পরবর্তীতে কি ঘটবে আমরা আগে থেকে জানি না তখন একটি অস্বস্তি শুরু হয়। এরপর ঐ পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার জন্য আপনার দক্ষতার মাত্রার উপর নির্ভর করে ঐ অনুভূতির তীব্রতা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেয়ে থাকে।

অজানা যে কোন কিছু আমাদের উদ্বিগ্ন করবে এটা একদমই প্রকৃতিগত একটি বিষয়। কিন্তু যখন আপনি কোন পরিস্থিতিতে উপস্থিত রয়েছেন এবং জানেন না এরপর ঠিক কি ঘটতে চলেছে তখন আপনার শরীর আপনাকে কিছু নির্দেশনা দেয় যা অনুভব করে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার ঐ পরিস্থিতি তে উপস্থিত থাকা দরকার নাকি একটু ব্রেক নেয়া দরকার।

শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি মোকাবেলা একটু বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তাদের সাথে জোরপূর্বক আগের মত হাস্যোজ্জ্বল আচরণ প্রত্যাশা না করাই শ্রেয়। তখন তাদেরকে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে সহযোগীতা দিয়ে ভিন্ন কিছু দক্ষতা শেখানোর মাধ্যমে সহযোগীতা দেয়া যেতে পারে। বিশেষ ক্ষেত্রে বিহেভিওর থেরাপিস্ট অথবা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

কিভাবে বুঝবেন কি ঘটছে

কিছু লক্ষণ দেখে আপনি আপনার এই অজানা আতঙ্ক অনুভব করার বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেন। আর নিজেকে ঐ অপ্রত্যাশিত আচরণের খোলস থেকে বের করে আনতে পারেন। অবশ্যই আপনার নিজের প্রত্যাশা ও ইচ্ছা এক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

শারীরিক কিছু সিগন্যাল যেমন- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, হার্ট এর দ্রুত উঠানামা, চোখে ঝাপসা দেখা, গলা শুকিয়ে আসা, হাত-পা কাঁপা ইত্যাদি।

    


মানসিক কিছু সিগন্যাল যেমন- অস্বস্তি অনুভব করা, অস্থিরতা থাকা, একা অনুভব করা, একদমই কোন অনুভূতি হচ্ছে না এমন হওয়া, মানসিক চাপ অনুভব করা ইত্যাদি।

এই উপসর্গ বা সিগন্যালগুলো আবার ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন মাত্রায় হতে পারে। যেমন ধরুন আপনি ইন্টারভিউ বা ভাইভা তে হয়তো কম মাত্রায় এই বিষয়গুলো অনুভব করছেন, অন্য পরিস্থিতিতে আবার বেশি মাত্রায় অনুভব করছেন। আবার অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টোটা হতে পারে।

যদি এ আতঙ্ক আঁকড়ে থাকি তো কি হবে

এই অজানা আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কগুলোর উপরে। সামাজিক সম্পর্কগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরের উপরে নির্ভরশীল। সাধারণত আমরা যেভাবে অন্যের সাথে আচরণ করে থাকি অন্যরাও ঠিক একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে, অনেক সময় এর ব্যতিক্রম হয়। তবে স্বাভাবিকভাবে সমান আচরণ হতে আমরা দেখে থাকি। যেমন- আপনি চিৎকার করে কোন কথা বললে আরেকজন আপনার সাথে শান্তভাবে কথা বলবে এটা সাধারণত হয়না। কেউ আমাদের সাথে রেগে কথা বললে আমরাও ঠিক ঐভাবে রেগে কথার উত্তর দিয়ে থাকি।

তাই আপনি যখন অজানা আতঙ্কে আতঙ্কিত থাকবেন। স্বাভাবিকভাবেই আপনার আশেপাশে বা কাছের মানুষগুলো আপনাকে নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। তাই এর থেকে বের হয়ে আসাটা খুব জরুরি। তবে ব্যক্তিত্ব ও পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা এটাকে দুইভাবে দেখে থাকি।  প্রথমত, আমরা অনেকেই  ঐ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যাই। যেটা সাময়িকভাবে ঐ আতঙ্ক থেকে আমাদের মুক্ত হতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, আমরা অনেকেই ঐ পরিস্থিতিতে উপস্থিত থেকে সেটির মুখোমুখি হই। যা দীর্ঘমেয়াদে ঐ পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে আমাদেরকে সাহায্য করে।

কিভাবে নিজেকে সহযোগীতা করব 

যদি আপনি বুঝতে না পারেন আপনার সাথে আসলেই কি ঘটছে তাহলে সহযোগীতা চাইতে দ্বিধা করবেন না।

- আপনার কোন বিশ্বস্ত বন্ধু বা শিক্ষক বা বয়োজ্যষ্ঠ্য কারো সাথে  বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।

- যদি আপনি নিজে থেকে বুঝতে পারেন যে এটি আপনার সম্পর্কগুলোকে রুগ্ন করে দিচ্ছে তাহলে নিজেকে সহযোগীতার জন্য থেরাপিস্ট বা মনোসামাজিক কাউন্সেলর এর শরণাপন্ন হতে পারেন।

- যদি আপনি বুঝে থাকেন যে আপনি ঠিক কি পরিস্থিতিতে আছেন এবং নিজে নিজে এর থেকে বের হতে পারবেন তাহলে নিজের একটি কর্মতালিকা প্রস্তুত করে নিতে পারেন যে ঐ পরিস্থিতিতে আসলেই কি কি করার মাধ্যমে ঐ অজানা আতঙ্ক কে আপনি মোকাবেলা করতে পারবেন। একটি কাজে না দিলে এর পরিবর্তে অন্য কি করা যেতে পারে সেটিও তালিকাভূক্ত করে নিন।

- প্রাণখুলে হাসুন, নিজের মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ব্যায়াম যেমন- মাইন্ডফুলনেস ব্রিদিং, শরীর শিথীলকরণ ব্যায়াম অনুশীলন করতে পারেন। নিজেকে জানতে ধ্যান বা নিজ নিজ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে পারেন।

- যে বিষয়গুলো সাধারণত আপনাকে উদ্বিগ্ন করে সে বিষয়ে আগে থেকে ধারণা নিতে পড়াশুনা ও জানার চেষ্টা করতে পারেন।

ভুলে যাবেন না ভয় পাওয়াও একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। ভয় পেয়েছেন বলে নিজেকে ছোট বা দুর্বল ভাবা আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী মানুষও ভয় পায় বলেই নিজের ভয় কে জয় করতে পেরেছেন। ভয় পাওয়ার মধ্যে দুর্বলতা নেই, দুর্বলতা হল ভয় পাওয়ার পর সেই ভয় আকঁড়ে ধরে পরে থাকার মধ্যে। আপনি আপনার সবচেয়ে উপকারী বন্ধু হয়ে অজানা ভয়ের আতঙ্ক থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।

আপনার জন্য রইলো শুভকামনা।

শাম্মী আক্তার
মনোবিদ
(মনোবিজ্ঞান গ্রাজুয়েট, কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞান পোস্ট-গ্রাজুয়েট) 



Comments