সন্তানের সাথে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন
পিতামাতা চান যেন সন্তান তার সব কথা শুনে, হোক সেটা ছোট বয়সে বা বড়। কিন্তু এটি তৈরি করতে আপনার প্রয়োজন শিশুর আস্থা অর্জন। আর এই আস্থা তৈরি করতে হয় শিশুর শৈশবেই।
মনোঃবিজ্ঞানী এরিকসন শিশুর মনোবৈজ্ঞানিক বিকাশের একটি ছক উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি শিশুর জন্ম থেকে ১ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে 'বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাস' স্থাপনের সময় বলে নির্ধারণ করেন। ঐ সময় যদি শিশু আপনার কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে থাকে, আপনার দেয়া আশ্বাস থেকে সত্যিই আশ্বস্ত হয়ে থাকে তাহলে এই বিশ্বাস স্থাপন সহজ হয়। যেমন, শিশুর কান্নার সময় আপনার আবেগ ঘন কণ্ঠস্বর নাকি কর্কশ কণ্ঠ, শিশুকে পরিচ্ছন্ন করার সময় আপনার স্পর্শ কতটা আদুরে, ক্ষুধা লাগলে অপেক্ষার সময়কাল কম নাকি বেশি , শিশুর অস্বস্তি দূর করতে আপনার পদক্ষেপ কি কি ইত্যাদি বিষয়গুলো শিশুর আপনার প্রতি আস্থা বা অনাস্থা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
আপনার মনে হতে পারে এতটুকু শিশু কি এতকিছু বুঝে? সঠিক উত্তর হল 'হ্যাঁ' ওরা যেমন বুঝে তেমনি প্রতিক্রিয়াও করে থাকে। সেজন্য আপনাকে সচেতন হতে হবে তাকে দেয়া ছোট ছোট কথাগুলো রাখতে। যেমন আপনি হয়ত বলছেন আমরা এখন খেলবো, কিন্তু আপনি ফোনে কথা বলা শুরু করলেন। এইটাও তার মনে আপনার ব্যাপারে একটা ছবি তৈরি করে দেয়। যেটাতে আপনার রূপ হয় একজন মিথ্যাবাদীর মত। শুনতে কর্কশ শুনালেও এভাবেই শিশুরা দিনের পর দিন ছোট ছোট দেয়া কথাগুলো , আপনার ছোট ছোট কাজগুলো থেকে আস্থা অথবা অনাস্থার বীজ বপন করতে থাকে।
যদি আপনার শিশুর বয়স ১ বছরের বেশি হয়ে থাকে আর আপনি আজকে প্রথম এই বিষয়টা জানছেন দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কারন এখনো সময় আছে আবার নতুন করে বিশ্বাস অর্জন করার। আপনি খেয়াল করলেই দেখবেন আপনার পক্ষ থেকে এমন কথা দেয়ার ঘটনা সবসময় ঘটে চলেছে। যেমন- তোমাকে আধাঘণ্টা খেলতে দিব, বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাব, শুক্রবারে শিশু পার্কে যাব ইত্যাদি। চেষ্টা করবেন যা বলেছেন সেটা যেন রাখতে পারেন। এমন কোন কথা দিবেন না যেটা রাখতে আপনাকে অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হয়। অথবা যেটা আপনি রাখতে পারবেন না। যেমন - এবার ঈদ এ নিউজিল্যান্ড যাব, এখনই তোমাকে গাড়ি কিনে দিব, এটা করলে মোবাইল কিনে দিব ইত্যাদি।
অনেকসময় এমন হতে পারে যে অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনার কারণে দেয়া কথা রাখতে পারেননি। যেমন - কোথাও যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু খুব বৃষ্টি বা ঝড়। এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনার সময় শিশুকে বুঝিয়ে বলুন যে কেন কথাটা রাখতে পারছেন না, আর তাকে ভিন্ন কোন আনন্দের কাজ করতে প্রস্তাব রাখতে পারেন। যেন সে অনেকটা একই রকম আনন্দ উপভোগ করতে পারে যদিও কাজটা ভিন্ন। তবে মনে রাখবেন বাইরে গেলে যেমন আপনার সাথে তার একটা যোগাযোগ বা ভাবের আদানপ্রদান ঘটত, সেটা যেন হয়। অর্থাৎ এমন কোন কিছু আনন্দের করুন যেন তাতে আপনার উপস্থিতি বা সংযোগ থাকে।
যদি আপনি আপনার দেয়া প্রতিশ্রুতি আর দেয়া কথা সঠিকভাবে পালন করতে পারেন। হোক সেটা খুব সামান্য তবু তা শিশুর আপনার প্রতি আস্থা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যা পরবর্তীতে তাকে আপনার প্রতি মান্য হতে সাহায্য করবে।
আপনি প্রস্তুত তো শিশুকে আপনার প্রতি নির্ভার আর আস্থার বীজ বপনে?
শাম্মী আক্তার
সহকারী কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী ও
বিহেভিওর থেরাপিস্ট (প্রাক্তন)

Comments
Post a Comment