অগোছালো খেলা আদ্যোপান্ত

’আপা, আমার বাচ্চাটা এলোমেলো করে খেলে, এটা কি কোন সমস্যা?’ 
’আর আমার বাচ্চাটা তো খেলাশেষে কিছুই গুছিয়ে রাখে না, আমি এত কাজের পরে আবার এসব খেলনা গুছাতে ক্লান্ত হয়ে যাই, কি করবো?’ এভাবেই বিভন্নসময় মায়েরা আমার কাছে কথাগুলো জানতে চান। আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক শিশুর খেলাধুলা নিয়ে বিস্তারিত।

শিশুরা প্রত্যেকেই আলাদা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হলেও কিছু বিষয় তাদের শিশু সুলভ আচরণের জন্য এক রকম মনে হয়। অনেক মা যখন দেখেন যে শিশু এলোমেলো করে খেলনা খেলছে এটাকে তিনি মনে করেন হয়তো শিশু স্বাভাবিকভাবে খেলতে পারছে না। আসলে বিষয়টি তা নয়।

ছবিঃ এই ছবিতে বিভিন্ন খেলার উপকরণ রয়েছে। প্রাণী পালন, গাড়ি চালনা, ব্লক দিয়ে খাবারের পাত্র বানানো, ছাড়াও অনেক রকম কল্পনাপ্রসূত খেলার পটভূমি রয়েছে।

আসুন একটু বিস্তারিত বুঝতে চেষ্টা করি, কি কি ধরনের খেলা সাধারণত শিশুরা খেলে থাকে। বাসায় বা নিজের পরিচিত পরিবেশে শিশুরা সাধারণত তিনভাবে খেলা করে থাকে।

১. বস্তু বা খেলনা দিয়ে প্রাসঙ্গিক খেলা

শিশুরা সাধারণত যে খেলনা দিয়ে খেলে সেটির ব্যবহার সঠিকভাবে করাকে আমরা প্রাসঙ্গিক খেলা বলতে পারি। যেমন- শিশুরা বল ছুড়ে, গড়িয়ে, বলে লাথি দিয়ে খেলা করা বা গাড়ি দিয়ে রেসিং খেলা, ব্লক দিয়ে খেলা ইত্যাদি খেলাধুলা করে থাকে। স্বাভাবিকভাবে এ খেলাতে তারা খেলনাটির সঠিক প্রয়োগ করে থাকে। অর্থাৎ গাড়ি দিয়ে গাড়ির সাথে প্রাসঙ্গিক ঘটনাপ্রবাহ সাজিয়ে তারা খেলা করছে। অথবা কোন বস্তুর সঠিক প্রয়োগ করে খেলা করছে। যেমন বাটি বা হাড়ি দিয়ে রান্না-বান্না ও খাওয়া-দাওয়া খেলা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে খেলনার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এটি কখনও কখনও কল্পনাপ্রসূত হতে পারে। যেমন- হাড়িতে খাবার নাই, কিন্তু শিশু চামচ নেড়ে কল্পনা করে নিচ্ছে  যে সে ভাত নাড়ছে, সামনে কেউ নেই কিন্তু সে তার বন্ধুকে বা পরিচিত কাউকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।

ছবিঃ এই ছবিতে একটি ঘোড়া পালনের খেলার পটভূমি দেখা যাচ্ছে। পাশেই সবুজ কাঁথা দিয়ে মোড়ানো একটা জায়গা যেখানে ঘোড়া থাকে। আর নীল পাত্রে ঘোড়াটিকে খাবার দেয়া হয়েছে।

আবার হতে পারে শিশু প্রাণী পালন করা খেলছে, খেলনা প্রাণীদের যত্ন নিচ্ছে, খেতে দিচ্ছে অথবা তাদের জন্য কাগজ দিয়ে ঘর বানাচ্ছে, বা ঐ প্রাণীর মত ডেকে ডেকে তার সাথে কথা বলছে। 

২. খেলনা দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক খেলা বা খেলনা দিয়ে কল্পনাপ্রসূত খেলা

আবার শিশুরা খেলনা দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক খেলা খেলে থাকে। যেটিতে তারা যে বস্তু বা খেলনা ব্যবহার করছে সেটির কাজ আসলে সেটি না। যেমন চামচ দিয়ে সে হয়তো গাছ বানিয়েছে, বা গাড়ি কে সে হয়তো আকাশে উড়াচ্ছে আর শব্দ করছে প্লেনের মত। আবার একটা ব্লককে সে বলছে যে খাও পানি খাও ইত্যাদি। অর্থাৎ শিশু কল্পনাতে ঐ খেলনাটির প্রয়োগ বা ব্যবহার নিজের মত ভেবে নিচ্ছে। যা আপাত দৃষ্টিতে ভুল মনে হতে পারে। কিন্তু শিশু শুধুমাত্র তার মত করে খেলছে এবং সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। এটি মোটেও কোন ভুল খেলা নয়। তবে যদি কোন শিশু শুধুমাত্র একভাবেই খেলা করে থাকে আর বস্তু বা খেলনার সঠিক ব্যবহার বুঝতে না পারে, বা না জানে তাহলে আপনাকে দায়িত্ব নিয়ে তাকে শিখিয়ে দিতে হবে। এবং খেলনাটির সঠিক ব্যবহার করতে সহযোগীতা করতে হবে। যদি শিশু জানে যে আসলে ঐ খেলনাটির সঠিক ব্যবহার কি এবং কিভাবে খেলা হয়ে থাকে আর তারপরেও অপ্রাসঙ্গিকভাবে খেলছে সেটি শুধুমাত্রই তার নিজস্ব মতামত বা বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ। এক্ষেত্রে কোনভাবেই শিশুকে ছোট না করে, বা কটু কথা না বলে তাকে তার মত খেলতে দিন। এতে করে তার সৃজনশীলতা ও কল্পনা শক্তির বৃদ্ধি ঘটবে। যা শিশুর মনোস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি আপনি লক্ষ্য করছেন যে, কোন নির্দিষ্ট খেলনা নিয়ে শিশু শুধুমাত্র অপ্রাসঙ্গিকভাবেই খেলছে, কোনভাবেই এর সঠিক প্রয়োগ বা সঠিক খেলা শেখাতে পারছেন না তাহলে শিশু মনোবিদ বা এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট বা চাইল্ড সাইকোলজিস্ট এর পরামর্শ নিন।



                                                                                       ছবিঃ ক                                                                    ছবিঃখ
            
ছবিঃ (ক)এই ছবিতে ব্লকগুলো বিভিন্ন প্রাণী আর তারা বালিশ দিয়ে ঘেরাও করা অর্থাৎ বালিশ হল দেয়াল ঘেরা ঘর। সামনে কাগজে তাদের প্লেট বানিয়ে খাবার দেয়া হয়েছে। (খ) মাঝের লাল ব্লকগুলো হাঁস, অন্য একটি হাঁসের সাথে সবাই তারা পুকুরে সাঁতার কাটছে।


৩. খেলনা বা বস্তু ছাড়া খেলা (কল্পনাপ্রসূত খেলা)

আরেকভাবে শিশুরা সাধারণত খেলা করে থাকে। যেমন কোন বস্তু বা খেলনা ছাড়া তারা কথা বলছে, বা খেলছে। যেমন হয়তো কোথাও বসে বা শুয়ে শিশু হাত নেড়ে, বা ধরে নিচ্ছে সে কোথাও একটা গেছে আর মজা করছে বা বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। যেমন- বাসায় বসে স্কুলে টিচার কি প্রশ্ন করেছিলেন সে কথার উত্তর দিচ্ছে, বা পিতামাতার কোন একটা ঘটনা বা কথাবলার ভঙ্গি অনুকরণ করে কথা বলছে ইত্যাদি। এছাড়াও আরো অনেক রকম খেলা আছে দলীয়ভাবে যে খেলাধুলা তারা স্কুলে বা খেলার জায়গায় খেলে থাকে সেটি নিয়ে আরেকদিন আলোচনা হবে। প্রতিটি খেলাই শিশুর মনোস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

এবারে আসি মায়েদের করা প্রথম প্রশ্নের উত্তরে, প্রথম প্রশ্ন ছিল শিশুর এলোমেলো করে খেলা কি কোন সমস্যা?, উত্তর হল ‘না’। শিশুর তার মস্তিষ্কে যেভাবে মিথস্ক্রিয়া করে আমরা বড়রা সেভাবে করিনা। আমরা অনেক আগেই সাজানোর কাজটি রপ্ত করে ফেলেছি বা গুছানো বলতে কি বুঝায় তার একটা অনুশীলন আমাদের মস্তিষ্ক শিখে ফেলেছে। কিন্তু সাজানো বা গুছানো বলতে আসলে কি বুঝায়, সেটি শিশুর মস্তিষ্কে পুরোপুরি রপ্ত হয়নি কারণ সে এখনো প্রতিনিয়ত ছোট ছোট করে শিখছে। আমাদের ছোটবেলার কথা যদি মনে করি তাহলে পরিস্কার হয়ে যাবে যে, আমরাও অনেকেই গুছিয়ে কথা বলা, বা কাজ করা শিখতে কতটা সময় নিয়েছি। তাই আমাদের দৃষ্টিতে যেটি অগোছালো সেটি শিশুর খেলার পটভূমিতে  একদমই স্বাভাবিক ও সাবলীল। যেমন- শিশু যদি এলোমেলো খেলছে দেখে আমরা গিয়ে গুছাতে যাই, দেখবেন যে সে কতটা বিরক্ত হচ্ছে। তার মনে হতে পারে যে তার খেলার পুরোটাই আপনি নষ্ট করে দিলেন। তাই তাদেরকে সেভাবেই খেলতে দিন যেভাবে সে খেলতে চায়। তবে হ্যাঁ নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। শিশুর খেলাধুলায় নিরাপত্তা ও নিজের মত খেলতে দেয়া সম্পর্কে আরো জানুন এই লিঙ্কে

এবারে আসি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে, খেলা শেষে শিশুর জন্য খেলনা গুছিয়ে রাখা একটা সুন্দর অভ্যাস। এটি একদিনে  তৈরি হবে না। তাই ধীরে ধীরে সময় নিয়ে ধাপে ধাপে শিখাতে হবে যে কিভাবে খেলনা গুছিয়ে রাখতে হয়। প্রথম দিকে তাকে গুছিয়ে রাখতে বলার পাশাপাশি আপনিও তাকে সাহায্য করবেন। এভাবে বলবেন যে, ’চল খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখি, আমাকে সাহায্য কর।’ যদি শিশু আপনাকে একটুও সাহায্য করে সেই আচরণটিকে উৎসাহিত করুন। আর যদি সে একেবারেই আপনাকে সহযোগীতা না করে তাহলে পরবর্তীতে আবার চেষ্টা করুন। কখনও কখনও তারা আগ্রহী নাও হতে পারে। পরবর্তীতে  কয়েকবার এভাবে আপনার তাকে সহযোগীতা করে একসাথে কাজটি করতে হবে। আর আপনাকে তার গুছিয়ে রাখার অভ্যাসটিকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে শিশু তার নিজের খেলনা নিজে থেকেই গুছিয়ে রাখতে শিখে ফেলবে। 

এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন-

১. আপনি তাকে নির্দেশনা দিবেন।

২. তাকে সহযোগীতা করবেন এবং ধীরে ধীরে সহযোগীতা কমিয়ে আনবেন।

৩. তার এই গুছিয়ে কাজ করার বা গুছিয়ে খেলার আচরণটিকে উৎসাহিত করবেন। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার মানসিক অবস্থার দিকেও দিতে হবে সমান গুরুত্ব।

শিশুরা খেলাধুলার মাধ্যমে তার পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। কখনও কখনও বড়রা খেলার মাধ্যমে শিশুকে প্রত্যাশিত আচরণ শিখিয়ে থাকেন। যে খেলার প্রেক্ষাপট বড়দের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। আবার দলগতভাবে বা একা যখন শিশুরা নিজের মত খেলাধুলা করে, তখন তার খেলার উপকরণ থেকে শুরু করে প্রেক্ষাপট ও ধারণা নিজেরাই তৈরি করে নেয়। এটি নিয়ন্ত্রণ না করে আপনি যদি প্রত্যক্ষণ করেন বা মনোযোগের সাথে দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে আপনার শিশু তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশে কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। কোন সময় খেলাধুলা বা পড়াশুনার ক্ষেত্রে তুলনা করা যুক্তি সঙ্গত নয়। কারণ প্রতিটি শিশু আলাদাভাবে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যতা তৈরির মাধ্যমে আচরণ ও ধারণা রপ্ত করে। প্রকৃতির এই শিক্ষণ উপকরণ বা পরিস্থিতিতে কোন শিশু দ্রুত গতিতে সাড়া দিতে পারে তো কেউ ধীর গতিতে, আবার কেউ একদমই সাড়া দেয় না আবার কেউ বেশি সাড়া দেয়। তাই আগে আপনার শিশুকে বুঝে নিয়ে তার পরে তাকে শেখান। প্রত্যেকের জন্য শিক্ষাপর্যায় হবে একেকরকম আর তাই ধৈর্য্য সহকারে প্রস্তুত হয়ে যান। আপনার জন্য ‍শুভকামনা।


লেখা-

শাম্মী আক্তার

(মনোবিদ)

কাউন্সেলিং সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাইকোলজি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়





Comments