মাস্ক পরিধান ও শিশুদের মনোসামাজিক আচরণ
করোনা পরবর্তী সময়েও আমরা অনেকেই মাস্ক ব্যবহার অব্যাহত রেখেছি। ঘরের বাইরে ধূলার আধিক্য ও গাড়ির কালো ধোঁয়া থেকে বাচঁতে আমরা মাস্কের কোন বিকল্প দেখি না। তাছাড়া ধুলাবালির মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবে কাশি বা ঠান্ডাজনিত রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বড়দের মধ্যেও অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করে থাকি আর আমরা আমাদের শিশুকেও মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহিত করে থাকি।
তবে অনেকসময় শিশুরা দীর্ঘ সময় মাস্ক পরিধানে অস্বস্তিবোধ করতে পারে। তখন সেটি খুলে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা অনুকরণ প্রিয় ও নিজ বয়সীদের সাথে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। স্কুলে যদি অন্যরা কেউ মাস্ক না ব্যবহার করে তখন শুধুমাত্র সে নিজে মাস্ক ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করবে না। এবং এটাই স্বাভাবিক। এটি তাদের সামাজিক আচরণের গুরুত্বকেও প্রকাশ করে। সে অন্য আর সবার মত একই রকম থাকতে চাইছে। এতে একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় যা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আবার খেলাধুলার সময় বা বেড়াতে গেলে সেই জায়গার ভিন্নতা ও তার পোশাকের সাথে নতুন করে একটি মাস্ক যুক্ত হওয়া বিভিন্নভাবে একেক শিশুর ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রভাব তৈরি করতে পারে।
এ বিষয়টা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ যে শিশুরা এক রকম আচরণ প্রদর্শন করবে না। তাই আমরা যারা সন্তানকে তার নতুন এই পরিধেয়টিতে অভ্যস্ত করতে চাইছি তাই আমাদেরকেও ধৈর্য্যসহকারে এ কাজটি করতে হবে। অনেকসময় আমরাও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ্য হই। তখন শিশুর জন্য এই আচরণটি শিখতে সময়সাপেক্ষ হয় অথবা কেউ কেউ শিখে আবার ভুলে যায়। যেমন আপনি হয়তো বাইরে গেলেই মাস্ক পড়াতেন একটা সময়। তখন শিশু প্রতিদিনের অভ্যাস থেকে এটি রপ্ত করে ফেলেছিল। আবার কয়েক সপ্তাহ হয়তো এটি অনুসরণ করেননি বা তাকে মাস্ক পড়ানোর ব্যাপারটি খেয়াল করেননি। তখন হঠাৎ একদিন দেখলেন যে শিশু আর মাস্ক পড়তে চাইছে না, অর্থাৎ তার অভ্যাসটি ছুটে গেছে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন অন্তত একবার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। এই ঘটনাটি অন্য অনেক নতুন আচরণ শেখানোর ক্ষেত্রেও আমরা লক্ষ্য করে থাকি।
অনেকসময় শিশু পথে চলতে মাস্ক ব্যবহারে আগ্রহী হলেও গন্তব্যে পৌঁছে মাস্ক খুলে ফেলতে পারে। সেটিও খুবই স্বাভাবিক একটি আচরণ। এক্ষেত্রে অভিভাবক যারা মাস্ক ব্যবহারে শিশুকে উৎসাহিত করতে চান তারা জোর পূর্বক শিশুকে মাস্ক মুখে রাখার চেষ্টা থেকে বিরত থাকবেন। বরং শিশুর স্বস্তি ও আচরণকে সমর্থন করলে এটি তার নিজের পরিবেশে নিজেকে খাপ-খাওয়ানোর জন্য সহযোগী ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু যেমন বিভিন্ন পরিবেশে স্থান ও ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক তৈরি করে তেমনি নিজের সাথে তার সম্পর্ক উন্নয়নে বিভিন্নরকম আচরণ রপ্ত করে থাকে। সেই আচরণের মধ্যে বাছাইকৃত সুআচরণ শেখানোর জন্য বল প্রয়োগ না করে বা ধমকের স্বরে না বলে, বুঝিয়ে বলতে হবে। এতে করে শিশু তার পরিবেশ থেকে নিজের জন্য সহনীয়মাত্রায় শিক্ষাউপকরণ বাছাই করতে শিখে নেয় এবং পরবর্তীতে অন্য খেলা বা শিক্ষণের ক্ষেত্রে সেটি কাজে লাগায়।
ব্যক্তিগতভাবে করোনা আসার অনেক আগে থেকে মাস্ক ব্যবহার করে আসছি। এখনও করছি। আমার সন্তানকেও মাস্কের ব্যবহারে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। আপনারাও মাস্ক ব্যবহার করার মাধ্যমে নিজের ও শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন। রোগব্যাধিমুক্ত জীবন অসম্ভব, তবে কিছুটা সাবধানতা ও সতর্কতা আমাদেরকে অতিরিক্ত কঠিন রোগ থেকে মুক্ত রাখতে কিছুটা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সকলের জন্য শুভকামনা।
লেখা-
শাম্মী আক্তার
(মনোবিদ)
কাউন্সেলিং সাইকোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
সাইকোলজি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


Comments
Post a Comment