অবক্ষয় ও হতাশা মোকাবেলার প্রথম ধাপ: শিশু বয়সের মনোস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা

 



বাবা মায়ের প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান নিয়ে লিখছি যে, আসুন না, আমরা আজকে থেকে আমাদের সন্তানদেরকে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করি। সন্তান যখন ৩-৬ বছর বয়সে থাকে তখন থেকেই তার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়টি তৈরি হওয়া শুরু হয়। তখন সে নিজেকে, নিজের পরিবারের মানুষকে কষ্ট পেতে বা অপমানিত হতে দেখতে চায় না। ঐ সময় থেকে শুরু করে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত সে মানসিকভাবে চড়াই উৎরাই এর মধ্য দিয়ে যায়। তখন তার নিরাপত্তার জন্য পিতামাতা বা খুব বিশ্বস্ত নিকট আত্মীয় কাছাকাছি থাকতে হবে।

এই সময়টাতে ছেলে বা মেয়ে দুজন'ই কোন না কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক সম্মানহানির স্বীকার হতে পারে। যা পরবর্তীতে নিজের প্রতি 'অপরাধবোধ বা ঘৃণা' তৈরি করে থাকে। এটি ভবিষ্যতের কোন 'না পারা' বা অপ্রাপ্তির সময় নিজেকে শেষ করার চিন্তাকে উস্কে দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রেই  যে এমনটা ঘটে তা নয়। অনেকেই নিজের অপ্রত্যাশিত চিন্তা আর বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আবার এই খাপ-খাওয়ানোটা কারো কারো ক্ষেত্রে অনেক কঠিনও হতে পারে। আবার কেউ কেউ একেবারেই খাপ খাওয়াতে ব্যর্থও হয়। তাই সন্তান যদি আপনাকে এমন কোন ঘটনার কথা বলে, যা তাকে কষ্ট দিয়েছে, বা তার অপমানবোধ হয়েছে বা কেউ তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে, তখন বাবা-মা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হবে সন্তানের অনুভূতিগুলোকে সম্মান করা। তাকে এমন কোন কথা না বলা যা তার আত্মসম্মানকে আঘাত করে।

আমরা ঐ কঠিন অভিজ্ঞতার সাথে সন্তানকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করতে পারি। যদি উল্টো তাকে দোষারোপ করি বা বকাঝকা করি সেটা তার জন্য নিজের সত্ত্বার উপরে একটা বড় হুমকি হয়ে যেতে পারে। কারণ সন্তানের জন্য আপনার উপস্থিতিটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কথা, আপনার আচরণ, আশ্বাস, কাজ সবকিছুই আপনার সন্তানকে প্রভাবিত করে। একই সাথে সন্তানের এই কষ্ট দেখা পিতামাতা হিসেবে আমাদের জন্যও অনেক কঠিন। তবে ঐ মুহূর্তে তার অনুভূতির সম্মান দেয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে বিষয়টা কারো কারো ক্ষেত্রে অনেক সামান্য কিন্তু সন্তানের কাছে হয়ত অনেক বড় কিছু। কোন কারণে তার প্রতি আপনার হয়ত রাগ থাকতে পারে, যেমন অনেকে বয়ঃসন্ধিতে এমন কোন ভুল কিছু করে বা হয়ে যায় যা হয়ত অনেক বাবা-মা এর নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। তখন অনেকেই হয়ত বুঝতে পারছেন না কিভাবে সন্তানের সাথে আচরণ করবেন বা পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। তখন নিজের করণীয় বুঝতে মনোবিদদের সহযোগিতা নিন। একজন মনোবিদ আপনার সন্তানের যেন মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষতি না হয় আর আপনার করণীয় বুঝতে বা মানসিক চাপ যেন কমে সে ব্যাপারে আপনাকে পাশে থেকে সহযোগিতা করতে পারবে।

পরিশেষে বলতে চাই, আমার সন্তানের সাথে ভালোবাসা আর সম্মান অটুট রাখতে আমাকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আমি যদি সন্তানকে সারাক্ষণ উপদেশ দিই, মানুষ হিসেবে সম্মান না দিই, আর প্রত্যাশা করি শুধু ভরণ-পোষণ আর লালন-পালন করার কারণেই আমাকে সে সম্মান দিবে, তাহলে এটা অযৌক্তিক। একসাথে ভাল সময় কাটানো মানে সমস্ত ইলেক্ট্রনিক্স জিনিস বাদ দিয়ে একসাথে কিছু সময় নিজেরা গল্প করা, প্রাণ খুলে হাসা, বা কাঁদা, প্রশংসা করা, আলোচনা করা, পরিকল্পনা করা, একসাথে কাজ করা বা সহযোগিতা করা, মনোযোগ দিয়ে কথা শুনা,  মনের ভাব প্রকাশ করতে দেয়া, বুকে জড়িয়ে আদর করা, একসাথে খেলাধুলা করা ( মোবাইল দিয়ে লুডু নয়) ইত্যাদি।

আসুন তবে নিজের সঙ্গীর উপরের রাগ, অভিমান, হতাশা, না পাওয়া এর কষ্ট সন্তানের উপর ছড়িয়ে না দেই। আমরা আমাদের সন্তানদের শারীরিক, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মনোস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা দিতেও সচেষ্ট হই। ভবিষ্যতের জন্য, পরবর্তীতে আসা কঠিন সময়ের মোকাবেলার আগে তাদের নিজের প্রতি ভালোবাসা তৈরিতে, আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সাহায্য করি। তাদের মধ্যে নৈতিকতা ও ধর্ম চর্চার মাধ্যমে মূল্যবোধের বীজ বপন করি।



শাম্মী আক্তার

সহকারী কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী

ইউনিভার্সিটি অফ লিবেরাল আর্টস বাংলাদেশ





Comments