সন্তানের জন্য পিতামাতার শর্তহীন নাকি শর্ত সাপেক্ষে ভালবাসা!
মা-বাবার ভালবাসা শর্তহীন। এটা শুনতে যতটা নির্মল শুনায় আদৌতে আমরা বাবা মায়েরা কি পারছি এই যুগে এসে নিঃশর্ত ভাবে সেটি করতে? নাকি কিছুটা সুন্দর শর্ত জুড়ে দিয়ে সন্তানের মঙ্গল কামনায় ভালবাসাও হচ্ছে শর্তযুক্ত! এই বিতর্ক হয়ত চলতেই থাকবে। তবে আজকের লেখার উদ্দেশ্য তর্ক চালিয়ে যাওয়া নয়। বরং সন্তানের প্রতি ভালবাসার আরও অর্থপূর্ণ দিক এর অনুসন্ধান করা।
সন্তান জন্মের পর পর পিতামাতার মধ্যে যে আমূল পরিবর্তন হয় এটি স্বর্গীয় আনন্দের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবে কিছু বাবা মা হয়ত কখনই নিজেকে সুখী ভাবেন না, যদি তাদের সন্তান আর দশজন সন্তানের মত না হয়। জন্ম যেমন-ই হোক না কেন ঠিক তেমন ভাবে গ্রহণ করে নেয়া তখন অনেক কঠিন হয় একজন পিতামাতার জন্য। কারণটা আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক ও মনো সামাজিক প্রেক্ষাপট। কিছু লোক সবসময় সমালোচনা করবে। কিছু সময় নিজেকে অসহায় মনে হবে। পরিস্থিতি যেমন ই হোক আপনি যখন এমন একজন যিনি এই রকম পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে তখন কিন্তু সন্তানের জন্য আপনার ভালবাসার শর্ত থাকবেই। হ্যাঁ নিঃশর্ত ভালবাসাও আছে। কিন্তু কিছুটা শর্ত জুড়ে দেয়া হয়ত উভয়পক্ষের জন্য স্বাস্থ্যকর।
সন্তান জন্মের পর পর যদি অন্য সব শিশুদের মত একটি সন্তান হয় তাহলে তার ধীরে ধীরে বেড়ে উঠার সাথে সাথে আমাদের আদর বা ভালবাসারও পরিবর্তন ঘটে। আবার সেটি দিন দিন অতিরিক্ত প্রত্যাশার বেড়াজালে বাঁধা পরে। আমাদের মধ্যেই অনেকে হয়ত তখন সন্তান কে আদর করি বা ভালবাসি, যখন সন্তান আমাদের কাছে এসে আদর প্রত্যাশা করে বা যখন আমরা কোন কারণে অনেক খুশী বা যখন সে আমাদের প্রত্যাশিত আচরণটি করে অথবা যখন এসব কিছুই ঘটে না কিন্তু আমরা শুধুই আদর করি বা ভালবাসি। আসলে একেকজনের ক্ষেত্রে হয়ত উত্তর একেকরকম হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিন্তু 'বিনিময়' বা 'শর্ত' থেকেই যায়।
আবার এর উল্টো দিকে বলা যায়। আমাদের ভালবাসাগুলো নিঃশর্ত, তবে এই ভালবাসা প্রকাশ করার সময় শর্তসাপেক্ষে হয়ে যায়। অর্থাৎ যে আচরণ এর মাধ্যমে আমরা ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাই সেটি তে শর্ত জুড়ে যায়। যেমন সন্তান কে সবাই ভালবাসে, কিন্তু মুখে বলি না যে ভালবাসি, পাছে ঘারে উঠে নাচতে থাকে!! তাই যখন সন্তান প্রত্যাশিত কিছু করে যেমন পরীক্ষায় ভাল ফল, কথা মান্য করা, পিতামাতার সম্মান বৃদ্ধি ইত্যাদি তখন আমরা খুশী তে আদর করি, উপহার দেই, বুকে জড়িয়ে ধরি।
তাহলে যে সন্তান আর দশজন সন্তানের মত আমাদের এই সব সাধারন শর্ত পুরণ করতে পারবে না সেই ক্ষেত্রে আমরা মা-বাবারা কি করব? আমরা কি তাদের নিঃশর্ত ভাবে ভালবাসতে পারব? ভিতরে কষ্ট ধরে রেখে হয়ত বলব যে পারব। কিন্তু নিজেকে ফাঁকি না দিয়ে আমরা যদি এই ভালবাসাকেও সুন্দর শর্ত যুক্ত করতে পারি, তাহলে তো নেহাত মন্দ হয় না বলুন। তবে সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশাগুলো হবে নির্দিষ্ট এবং একই সাথে সন্তানের পক্ষে সেটি অর্জন ক্ষমতার মধ্যে থাকতে হবে। যেমন একটি শিশু যদি শুধুমাত্র বসতে বললে বসতে পারে কিন্তু অন্য সব কিছু করতে তার অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয় তাহলে তার অর্জন করার ক্ষমতা হল সুন্দর ভাবে বসতে পারা। তাই সুন্দর করে বসলে তাকে ভালবাসুন বা আদর করুন। এর মানে এই না যে আপনার সন্তান কে আপনি অন্য সময় আদর করবেন না। তবে অপ্রত্যাশিত আচরনের সময় তাকে ভালবাসা বা আদর থেকেও বিরত থাকুন। এটি তাকে প্রত্যাশিত আচরণ শেখাতে সহযোগিতা করবে। এভাবে আপনার প্রত্যাশাগুলো সন্তানের সক্ষমতার সাথে মিলিয়ে তৈরি করে নিন। যা তাকে আপনার ভালবাসা পাওয়ার জন্য আরও উৎসাহিত করবে। আর সেই সাথে আপনাকেও নিঃশর্ত ভালবাসার কঠিন সমীকরণ থেকে মুক্ত রাখবে।
শাম্মী আক্তার
সহকারী কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী ও
বিহেভিওর থেরাপিস্ট (প্রাক্তন)

Comments
Post a Comment