সন্তানের জন্য পিতামাতার ইতিবাচক পরিবর্তন

র্তমানে কিশোর-কিশোরী সন্তানের বাবা মায়ের পক্ষে বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানদের সাথে তাল মিলিয়ে চলা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। যুগে যুগে এই সময়টাতে পিতামাতা সন্তানদের সাথে তাল মেলাতে কসরত করলেও এই প্যানডেমিক (করোনা) কালে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম একটি চ্যালেঞ্জ এর বিষয়।একদিকে ইন্টারনেট আর ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস এর প্রতি তাদের আসক্তি আর অন্যদিকে সন্তানের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক যেন দাঁড়িপাল্লার দুই দিক। আজকে এই বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করব। 

মনোসামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের মনোস্তাত্ত্বিক উন্নয়নের যে কথা বলেছেন তার মধ্যে বয়ঃসন্ধিকাল একটি। ঐ সময়ে তখনও তাদের মস্তিষ্ক গঠনের কাজ চলতে থাকে আর সেই সাথে চলে বিভিন্ন পরিবর্তন (যেমন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক)। এটা তাদের জন্য অনেক অস্বস্তিকর। তার উপর পারিপার্শ্বিক ভাবে করোনাকালে এটা আরও বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

আমরা বাবা মায়েদের মনে হতে পারে, যে আমরাও তো এই সময় পার করেছি। হ্যাঁ। একটু খেয়াল করলে বা স্মরণ করলে দেখবেন যে আপনার ঐ বয়ঃসন্ধি সময়টাতেও আপনি অন্যরকম ছিলেন। শিশু থেকে হঠাৎ একজন পরিবর্তিত কেউ, যে কিনা বড়দের দলেও না আবার শিশুদের দলেও না। কেমন যেন দল ছাড়া। আমাদের সৌভাগ্য ছিল যে তখন করোনা ছিল না। স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল না। অনেক ব্যস্ত থেকে বিভিন্ন ভাবে সময়টা তাই দ্রুত পার হয়ে গেছে। অনেকের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে এই সময়টা শুরু হয়ে যায়। স্থান আর জাতি ভেদে যদিও সময়টা পরিবর্তিত হয়। আমার মনে হয় যে বর্তমানে শিশুদের শারীরিক বর্ধন বেশি হওয়ায় এই পরিবর্তন খুব দ্রুত শুরু হচ্ছে। আর শুধুমাত্র বয়ঃসন্ধিকালে নয়, এর আগের ও পরের ২ থেকে ৩ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্যানডেমিক এর সময় অনেক অভিভাবক বাড়িতে থেকে সন্তানকে সময় বেশি দিতে পারলেও সুসম্পর্ক তৈরি কিভাবে করবেন তা জানা না থাকায় সময়টাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।

মনে রাখা জরুরি যে সন্তানের আচরণ পরিবর্তনের আগে আপনাকে আপনার নিজের অপ্রত্যাশিত আচরণ পরিবর্তনেই বেশি জোর দিতে হবে। তাই সন্তানকে দোষারোপ করার আগে নিজেকে সু-আচরণে অভ্যস্ত করে নিতে হবে। আর একটা জরুরি বিষয়, শুধুমাত্র মা'য়েরা সন্তানের নেতিবাচক আচরনের জন্য দায়ী নন, এক্ষেত্রে পিতার সমান ভূমিকা রয়েছে। তাই সন্তানকে ইতিবাচক আচরণে পরিবর্তিত করতে হলে পিতা-মাতা দুজনকেই সমানভাবে নিজের নেতিবাচক আচরণগুলো বদলে ফেলতে হবে। আমি বলছি না এটা হুট করে হবে। একটু একটু করে শুরু করি। তাহলে আসুন জেনে নেই কি কি উপায়ে ইলেকট্রনিক্স আসক্তি কমিয়ে সুন্দর সম্পর্ক তৈরিতে সন্তানকে আমরা সাহায্য করতে পারি তার কিছু টিপস নিচে দেয়া হল-

১। আপনি যদি অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটান, আর রাত জেগে থাকেন (হয়ত বিনোদন, বা কাজের জন্য) তাহলে আপনি এটা প্রত্যাশা করতে পারেন না যে আপনার কিশোর সন্তান সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসবে। আপনার দেরীতে ঘুমের অভ্যাস পাল্টে সকালে উঠার চেষ্টা করতে হবে। সাধারণত অনেক মায়েরা নাস্তা তৈরি বা ঘরের কাজের জন্য তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেন, তাই বাবাদেরকেও  এ ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবে। (ব্যতিক্রমী বাবা-মায়েদের অনেক ধন্যবাদ)।

২।  ঘুম থেকে উঠেই যদি আপনার ল্যাপটপ, টিভি, মোবাইল, ট্যাব নিয়ে বসার অভ্যাস থাকে তাহলে সেটাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। আপনাকে ইলেকট্রনিক্স এর পরিবর্তে অন্য কাজগুলো করতে হবে। যেমন - শরীর চর্চা, খবরের কাগজ পড়া, ধর্মীয় আচার যেমন প্রার্থনা বা নামাজ আদায়, কুরান/বাইবেল/পুরাণ তেলাওয়াত করা ইত্যাদি।

৩। আপনি যে কাজ ই করেন না কেন সন্তানকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করুন। বই বা খবরের কাগজ পড়ার সময় তাকেও দুই এক পাতা পড়তে দিন। গাছ লাগানো, পশু-পাখি পালনে সহযোগিতা চেয়ে তাকেও কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করুন। (বয়ঃসন্ধিকালের আগে থেকে এটা অনুশীলন করতে হবে, তাহলে সে পরবর্তীতেও এগুলো থেকে আনন্দ পাবে, হঠাৎ করে কোন কাজে অংশ নিতে বললে সেটা তার জন্য মানসিক চাপের সৃষ্টি করতে পারে।) 

৪। ঘরোয়া খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখুন। মোবাইলে বা অ্যাপ্সের মাধ্যমে লুডু না খেলে সরাসরি বোর্ড গেইম যেমন ক্যারাম, মনোপলি, বিশ্বলুডু ইত্যাদি খেলা আপনার সাথে খেলতে তাকে উৎসাহিত করুন।

৫। বিভিন্ন ক্র্যাফট বানানো, গান শেখা, নাচ শেখা, শৈল্পিক কাজ, রান্না-বান্না, ড্রয়িং, পেইন্টিং, হাতের কাজ, পশু-পাখি পালন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ ইত্যাদি নিজেও করুন আর সন্তানকেও অংশগ্রহণ করান।

অনেক বাবা-মা ঘরের বিভিন্ন কাজ কর্মচারী বা কাজের লোকের মাধ্যমে করিয়ে থাকেন, আর মনে করেন যে সন্তান কেন এত কষ্ট করবে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, হাতে কলমে আপনার পাশে পাশে এসব কাজ করার মাধ্যমে সন্তানের মধ্যে পরিকল্পনা তৈরি, যত্নশীল হওয়া, হাত ও চোখের সমন্বয় তৈরি, গুছানো ও সৃষ্টিশীলতা, নেতৃত্ব ও সমন্বিত করার দক্ষতার মত চমৎকার সব দক্ষতা তৈরি হতে পারে। এই সব দক্ষতা অর্জনের জন্য তখন আর বড় বড় কোর্স করতে হবে না। 

আর স্ক্রিন টাইম বা ইলেকট্রনিক্স ব্যাবহারের জন্য সময় যে দিবেন না তা তো নয়। এটা অবশ্যই আপনার নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দিবেন। বয়স ১৮ বা ২১ হওয়ার আগে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ট্যাব বা মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যাবহার করতে দেয়া হলে সন্তান সেটি ব্যবহারে অসতর্ক হবে। ফলশ্রুতিতে কিশোর গ্যাং, নেশাগ্রস্ততা, বিভিন্ন ফাঁদ এসব ব্যাপারে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কখন তাকে স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিবেন। যেহেতু এই বয়সে মস্তিস্ক পুরুপুরি গঠন হয় না তাই তারা সঠিক/ ভুল, ভাল/মন্দ  পার্থক্য করতে পারেনা। এটা তাদের দোষ নয়। তাই কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার আগে সচেতন হোন। যদি অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রেগে কোন শাস্তি বা আঘাত না দিয়ে সময়, ধৈর্য ও বিবেচনা নিয়ে সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে।  

আসুন একটু পেছনে হেঁটে বয়ঃসন্ধি কালে নিজে কেমন ছিলাম সেটা মনে করে দেখি। এবং নিজেকে ভাল কিছুর জন্য পরিবর্তিত করি। সন্তানও ইতিবাচকভাবে আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।

তো আপনি তৈরি তো নিজের নেতিবাচক অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য।


শাম্মী আক্তার

সহকারী কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী ও

বিহেভিওর থেরাপিস্ট (প্রাক্তন)

Comments